নারী শিক্ষায় সংগ্রাম করা এক অধ্যক্ষকে শিক্ষামন্ত্রীর ফোন

কুড়িগ্রামের রৌমারি চরাঞ্চলে নারীশিক্ষা প্রসারে সংগ্রামী একজন অধ্যক্ষকে টেলিফোন করে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। রৌমারি উপজেলা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে দুর্গম চরাঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন শিক্ষানুরাগী হুমায়ুন কবির। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চরশৌলমারি আদর্শ মহিলা মহাবিদ্যালয়। সরকারি কোনো অনুদান ছাড়াই ৯ জন শিক্ষক আর সাত কর্মচারী দিয়ে নারীশিক্ষা প্রসারে নিভৃতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সরকারি অনুদান ও সহায়তা ছাড়াই নারী শিক্ষায় এককভাবে ভূমিকা রাখার বিষয়টি অবগত হয়ে নতুন শিক্ষামন্ত্রী গতকাল সকালে সচিবালয়ে নিজ অফিস থেকেই অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরকে ফোন করে কথা বলেন। এ ব্যাপারে দুপুরে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যেকোনো ভালো উদ্যোগের সাথে থাকবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি সরকারের ও আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার। মন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তাকে এ ধরনের কাজের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছি। সব ধরনের সহায়তার কথা বলেছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষামন্ত্রী অধ্যক্ষকে ফোন করে প্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যার কথা শুনেন এবং সেগুলো সমাধানে আশ্বাস দেন।

জানা গেছে, সকাল সকাল শিক্ষামন্ত্রীর ফোন পেয়ে অনেকটাই বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না চরশৌলমারি আদর্শ মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির। অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। হুমায়ুন করিব তার অনুভূতির কথা জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, জগন্নাথ কলেজ থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স করার পর এলাকায় চলে আসি। চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা চিন্তা না করে এলাকায় এসে সিদ্ধান্ত নেই যে, সর্বস্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কাজ করব। সে অনুসারে দুর্গম চরাঞ্চলে নারীশিক্ষা প্রসারে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করি চরশৌলমারি আদর্শ মহিলা মহাবিদ্যালয়। মন্ত্রীর এ ফোন আমার এ উদ্যোগকে অনেক দূরে এগিয়ে নিবে।

তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, এলাকার মাধ্যমিক স্কুল শেষ করে মেয়েদের কলেজে ভর্তির কোনো সুযোগ ছিল না। অভিভাবকেরা তাদের মেয়েসন্তানদের পাত্রস্থ করেই দায়মুক্তি নিতেন। ২০১৩ সালে চরশৌলমারি আদর্শ মহিলা মহাবিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিকে অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও এখন স্থানীয় কিছু বিত্তবান সামান্য সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৬০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর অ্যাকাডেমিক অনুমতি পেলেও সরকারি কোনো অনুদান পায়নি। নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, মেয়েদের স্বাস্থ্যকর কোনো টয়লেট নেই, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই, সীমানা প্রাচীর নেই, মেয়েদের খেলাধুলা করার মতো কোনো সরঞ্জামও নেই। অবহেলিত এই মেয়েদের শতভাগ উপবৃত্তি ও আর্থিক অনুদান দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানান তিনি। গ্রামে বসে একজন মেয়ে যাতে সর্বোচ্চ শিক্ষাটা নিতে পারে সেজন্য এ প্রতিষ্ঠানটিতে অনার্স, ডিগ্রি ও মাস্টার্স কোর্স চালু করার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। কারিগরি বোর্ডে ভোকেশনাল কোর্স (বিএম) চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।

কলেজটির বিদ্যমান চিত্র বলতে অধ্যক্ষ হুমায়ুন করিব জানান, পুরো কলেজটি দুইটি টিনের ঘরে মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। নেই পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল, আধুনিক সুবিধা বলতে কিছুই নেই। শিক্ষার্থীদের বেতন নেয়া তো দূরে থাকা, উল্টো তাদের বইসহ শিক্ষা উপকরণ কিনে দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানে আয় বলতে এলাকার কিছু বিত্তবানদের অনিয়মিত কিছু অনুদান।

কুড়িগ্রাম শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রৌমারি উপজেলা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানে দুইটি নদী ব্রহ্মহ্মপুত্র নদ এবং হলিয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। বর্তমানে ৬০ জন ছাত্রী পড়াশুনা করছে। ৯ জন শিক্ষক এবং সাতজন কর্মচারী বিনা বেতনে পড়ান। বছর শেষে পরীক্ষা ফরম পূরণ বাবদ অল্প কিছু টাকা পান তারা। এখনো শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়িতে গিয়ে কলেজে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*