নির্বাচনের পর বিএনপির প্রার্থীদেরও দেখা নেই

বরিশালের ছয় জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে গ্রেফতার ৪০০ থেকে ৫০০ নেতাকর্মী এখনও কারাগারে রয়েছেন। জামিন বা মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কোনো দলীয় সাহায্য-সহায়তা পাচ্ছেন না।

এদিকে, দক্ষিণের ২১ আসনে নির্বাচনের আগে দু-একজন প্রার্থী এবং বাকিরা ভোটের দু-এক দিন পর এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। এর পর থেকে এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের তেমন যোগাযোগ নেই। এ অবস্থায় দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মীদের অংশ নেয়া তো দূরের কথা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই যেন মুশকিল হয়ে পড়েছে।

শুরু থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ ছিল বেশ কয়েকটি আসনে। বছরের পর বছর নির্বাচনী এলাকায় না আসাসহ দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত নেতাদের মনোনয়ন দেয়া নিয়ে ক্ষোভ ছিল দক্ষিণের ৮ থেকে ৯টি নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচনের পর তাদের অনুপস্থিতি এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।

বরিশাল-১ আসনে বিএনপির এক সময়কার সংস্কারপন্থী নেতা জহির উদ্দিন স্বপনের মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিলেন সেখানকার বিএনপি নেতাকর্মীরা। নির্বাচনের দু’দিন পর তিনি ঢাকায় চলে গেলেও আজ পর্যন্ত আর এলাকায় আসেননি। এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে গৌরনদী উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, বরিশাল-১ আসনের দুই উপজেলার শতাধিক নেতাকর্মী এখনও জেলে। হাইকোর্টে তাদের জামিনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে স্বপনের কোনো সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি না।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ক্ষমতাসীন দলের হামলা মামলা আর নিরাপত্তার অভাবে এলাকায় যেতে পারছি না। তবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, এটা সত্য নয়।

বরিশাল-৫ (সদর) আসনে মজিবর রহমান সরোয়ার এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে আবুল হোসেন ছাড়া বাকি চার প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে।। নির্বাচনের দুই দিন আগে লাপাত্তা হন বরিশাল-২ আসনের প্রার্থী সরফুদ্দিন সান্টু। বাকিরা নির্বাচনের দু-এক দিন পর এলাকা ছেড়ে যান।

হাইকোর্টে জামিনের ক্ষেত্রে বরিশাল-৩ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে নেতাকর্মীরা আইনি সহায়তা পেলেও অন্যদের দেখাই মিলছে না।

গত সপ্তাহের শেষের দিকে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নূপুর। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ঝালকাঠি-১ আসনে দলীয় প্রার্থী শাহজাহান ওমর ভোটের দু’দিন পর ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় বসে তিনি জামিনের ব্যাপারে কিছু সহযোগিতা দিলেও পুরোপুরি ব্যতিক্রম ঝালকাঠি-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া জিবা আমিন খান। ভোটের দিন এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যাওয়া জিবা নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখছেন না। অথচ এ জেলার ১২৩ নেতাকর্মী এখনও জেলে।

পিরোজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা আমরা করিনি। পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামিম সাঈদী এবং পিরোজপুর-২ আসনে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে মনোনয়ন দেয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে এ দুই প্রার্থীর কোনো রকম যোগাযোগ ছিল না। প্রচারেও দেখা যায়নি তাদের। নির্বাচনের পরপরই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া এ দুই নেতা এখন কোথায় আছেন তা কেউ জানে না। নির্বাচনের সময় পিরোজপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল জেলে ছিলেন। গত সপ্তাহের শেষ দিকে তিনি জামিনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

দুলাল বলেন, পিরোজপুরের ৮০-৯০ জন নেতাকর্মী এখনও কারাগারে। তাদের মামলার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। অথচ যারা দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নাম কামালেন তারা এখন উধাও।

পটুয়াখালী-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির এক সময়কার সংস্কারপন্থী নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরী এলাকা ছাড়েন নির্বাচনের একদিন পর। এরপর সাবেক মন্ত্রী আলতাফ চৌধুরী আর এলাকায় যাননি।

জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, ১০-১১ বছরে সর্বোচ্চ চার থেকে পাঁচবার এলাকায় এসেছেন আলতাফ চৌধুরী। দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া তো দূরের কথা, দীর্ঘ এ সময়ে একটা মামলা কিংবা একদিনের জন্যও এ নেতা জেলে যাননি।

কুট্টি আরও বলেন, জেলা বিএনপির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও যে নেতা বছরে একবার এলাকায় আসেন না, নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখবেন না, এটাই তো স্বাভাবিক। অথচ এখনও আমাদের বহু নেতাকর্মী জেলে রয়েছেন। মামলা পরিচালনাসহ কোনো ক্ষেত্রেই তারা সহযোগিতা করছেন না।

পটুয়াখালী-১ আসনের মতো জেলার অপর তিনটি নির্বাচনী এলাকায়ও একই পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে এসে মুহূর্তেই ধানের শীষ পাওয়া সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি পটুয়াখালী-৩ ছাড়েন ২ জানুয়ারি। পটুয়াখালী-২ আসনে মনোনয়ন পাওয়া সালমা আলম লিলি ঢাকায় যান নির্বাচনের পরপরই। নির্বাচনের ২ থেকে ৩ দিন পর যান পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ আর এলাকায় আসেননি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও নেই তেমন যোগাযোগ।

বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া মতিউর রহমান তালুকদারের সঙ্গে মোটামুটি যোগাযোগ আছে এলাকার নেতাকর্মীদের। তবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে একেবারেই যোগাযোগ করেন না বরগুনা-২ আসনের বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব। নির্বাচনের একদিন পর এলাকা ছেড়ে ঢাকায় যাওয়া এ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না নির্বাচনী এলাকার অধিকাংশ বিএনপি নেতাকর্মী।

বিপদে আছে ভোলা জেলার চারটি নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীরাও। ৩০ ডিসেম্বর রাতে নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান ভোলা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম। এরপর তিনি আর এলাকায় আসেননি। ভোলা-৩ আসনের প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ এবং ভোলা-৪ আসনের নাজিমউদ্দিন আলম ঢাকায় যান ৩১ ডিসেম্বর। এরপর থেকে তারা আর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ রাখছেন না।

তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সংস্কারপন্থী হাফিজ বিএনপির মূলধারার ধাওয়া খেয়ে আট বছর আগে এলাকা ছাড়েন। এরপর আর এলাকায় আসেননি তিনি। কেন্দ্র তাকে মনোনয়ন দেয়ায় ক্ষোভ ছিল নেতাকর্মীদের মধ্যে। যে নেতা তার অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য এলাকায় আসতে পারতেন না তিনি কী করে কর্মীদের দুঃখ বুঝবে? এমপি প্রার্থীদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াই কেবল নয়, এবার দক্ষিণের প্রায় কোথাও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়নি।

পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, দেশে কী কোনো আইনের শাসন আছে? বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘর থেকে বেরুতে পারেন না। এমপি প্রার্থীদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এ অবস্থায় নিরাপদে থাকার চেষ্টা করা নিশ্চয়ই অন্যায় নয়। তবে এর মানে এই নয় যে, আমরা দুর্বল। এটা ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল মাত্র। আশা করি খুব শিগগিরই বিপুল উদ্যমে আন্দোলনের মাঠে নামবে বিএনপি।

এই সংবাদটি যুগান্তর অনলাইন পোর্টাল থেকে সংগ্রহীত\

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*