ছাত্রদলকে আদুভাই বলা হচ্ছে কেন?

ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসমুখী হয়েছে ছাত্রদল। পরিবেশ পরিষদ এর আয়োজনে ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছে নিয়মিত। বৈঠক করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে। স্মারকলিপি দিচ্ছে নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে।

সম্প্রতি একটি বড় রকমের শোডাউন দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ছাত্রদল। ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি প্রদানকে কেন্দ্র করে এই শোডাউন করে দলটি। শোডাউনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রদলের বয়স্ক শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এর মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকীসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতৃবৃন্দ।

ছাত্রদলের এই শোডাউনের ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ বলছেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর সহাবস্থান হতে যাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতিতে নতুনত্ব সৃষ্টি হবে। আবার কেউ বলছে, ছাত্রদলের আদু ভাইয়েরা ক্যাম্পাসে শোডাউন দিয়ে চলে গেলো। শান্ত ক্যাম্পাস নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে নাতো?

এভাবে সমালোচনা করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও রাজনীতিক নেতারাও।

নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সৈয়দ আশিক লিখেছেন: ভেবেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় বয়স্ক শিক্ষা-কার্যক্রম চালু হয়েছে। পাশ থেকে কেউ একজন বললো ওরাই আদি ও আসল ছাত্র । বয়স ৪০ এর কাছাকাছি। ওরা দল। ওরা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

আরেকজন শিক্ষার্থী লিখেছেন: আবারও ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। অছাত্রদের ভিড় বাড়বে। আদু ভাইদের আগমন ক্যাম্পাসে। এবার নতুন উত্তেজনা শুরু হবে।

শুধু দেশেই নয়। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও থেমে নেই ছাত্রদলকে নিয়ে ট্রল করতে। যেমনটা লিখেছেন রাশিয়ায় অধ্যয়নরত ধিমান রায় রাহুল: ছাত্রদলের নামে যে আঙ্কেলরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করে এরা কারা?’

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় অনেক শীর্ষ নেতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন খোঁজ করেও তাদেরকে নিয়ে ট্রল করার কারণ স্পষ্ট হলো। অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কারোরই ছাত্রত্ব নেই। বিশেষ করে শীর্ষ চার ছাত্রদল নেতার। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আকরামুল হাসান ভর্তি হন ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ২০০২-০৩, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকী ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেই হিসেবে তারা চারজনও নিয়মিত ছাত্রের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক আগেই। এ ছাড়া সংগঠনটির বিভিন্ন হল শাখার নেতাদেরও ছাত্রত্ব নেই।

নিজেদের মধ্যকার এই সংকটের বিষয় বিবেচনা রেখেই ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে কোনো বয়সসীমা চায় না। ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ৩০ বছরের যে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রার্থিতার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আর প্রশাসনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও ঐক্যমত প্রকাশ করেছে।

ছাত্রদলের দাবি-দাওয়াকে অযৌক্তিক এবং অছাত্রদের দাবি মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: তাদের দাবি অযৌক্তিক। তারা বিভিন্ন উপায়ে ডাকসু নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চায় বলেই এসব দাবি নিয়ে আসছে। ছাত্রদল অছাত্রদের নেতৃত্বে চলছে, যা বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যায় না।

সাদ্দাম হোসাইন বলেন: ছাত্রদল দাবি জানাচ্ছে ডাকসু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বয়স সীমা থাকবে না। এর মাধ্যমে তারা এই ক্যাম্পাসে আবারও অছাত্রদের রাজনীতি চালু করতে চায়। ফলে শিক্ষার্থীরা এসব নিয়ে সমালোচনা করছে, ট্রল করছে, ছাত্ররা আদু ভাই বলে ডাকছে। কেননা ছাত্রদলের নেতৃত্বের দিকে তাকালে সেটাই প্রমাণ করে।

ছাত্রদলকে নিয়ে সমালোচনা ও ডাকসু কেন্দ্রিক তাদের ভাবনা নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এটা আসলে আমাদের প্রচারণার অভাবে হচ্ছে। আমরা বিগত ১০ বছর যাবৎ ক্যাম্পাসে যেতে পারছি না। এতে আমাদের কথা ও আমাদের যে যুক্তিগুলো হয়তো আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করতে পারছি না বলেই তাদের মাঝে একটা নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে বয়সের ব্যাপারটা সামনে তুলে আনা হয়েছে। অতীতে কখনোই ছাত্ররাজনীতি বয়সের ধরাবাধা নিয়মের মধ্যে ছিলো না।

আকরামুল হাসান যুক্তি দিয়ে বলেন: আমরা যদি দেখি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অবস্থায় ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার প্রায় দুই যুগ পরে সুলতান মনসুর প্রায় ৪০ বছর বয়সে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। এখানে বলা হয়েছে যুগের পরিবর্তন হয়েছে। তাহলে মুজাহিদুল ইসলাম ও সুলতান মনসুরের ব্যাপারটিকে কিভাবে বিবেচনা করবেন? শুধুমাত্র একটি সংগঠনের নেতিবাচক প্রচারণার কারণে তাদের মনে হচ্ছে যে শুধু তরুণরাই ছাত্রদের পক্ষে কথা বলতে পারে। দীর্ঘদিনের বাংলাদেশের রাজনীতির যে টানাপোড়েন ও গণতন্ত্রহীনতা, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই কিন্তু ছাত্রদলের নেতাদের যৌবনের যে স্বর্ণালী সময়টা তা পার করেছে। দেশের ছাত্রসমাজ ও গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের এই যৌবনটা ব্যয় করেছে।

তিনি বলেন: আমরা সহাবস্থানের কথা বলেছি। হল এবং ছাত্র সংসদ ফি প্রদান করে তাদের সকলকে ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার সুযোগ প্রদানের ব্যাপারে আমরা দাবি তুলেছি। আমরা দাবি তুলেছি ভোট কেন্দ্রগুলি হলে হলে না রেখে একাডেমিক ভবনগুলোতে স্থাপনের জন্য। সিসি টিভির আওতায় আনার দাবি করেছি। প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বয়সসীমা তোলে দিতে দাবি করেছি। এই সব দাবি পূরণ না হলে তো অনেকে সংক্ষুব্ধ হবেন। নিজেদের মৌলিক অধিকার তথা ভোট বা প্রার্থী হতে না পারলে এখানে তো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা ব্যাপারগুলো নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। তখন কিন্তু এই নির্বাচনটা ভণ্ডুল হওয়ার বা বাধাগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমরা আশংকা করছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দূরভিসন্ধির অংশ হিসেবেই যেন ডাকসু নির্বাচন কার্যকর না হয় তার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। আর ৩০ বছর বয়সসীমা করা হয়েছে শুধুমাত্র একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের জন্য। আমি বিশ্বাস করি, এখানে বয়স বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায়ের পক্ষে ছাত্রদলকে অতীতে যেমন তাদের পক্ষের ও আস্থার শক্তি মনে করেছে। আগামী দিনেও ছাত্রদলকে তাদের আস্থার প্রতীক মনে করবে। তাদের রায় প্রয়োগ করবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন: ছাত্রদলের জন্য এটি কঠিন বাস্তবতা। যদিও সবাই চায় নিয়মিত ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠন পরিচালিত হোক। কিন্তু এটা দেশের রাজনীতিক প্রেক্ষাপটে হয়ে গেছে। এর পরিবর্তন বা সংস্কার হতে সময় লাগবে।

তিনি বলেন: ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করতে পারে না। টিএসসি দাঁড়িয়ে চা খেতে পারে না। তারা সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। এগুলো মূল বিষয়। কোন বয়সে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে এটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চা কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রে মুক্তবুদ্ধি চর্চা করতে পারছে কিনা, হলে থাকতে পারছে কিনা, সহাবস্থান নিশ্চিত করা গেলে তো ছাত্রদলের এই অবস্থা থাকতো না আর এই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার জায়গাটিও থাকতো না। আর ডাকসু নির্বাচনে যে বয়স সীমা করে দেওয়া হলো, গুটিকয়েক কারো কারো ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় তা করা হয়েছে। বয়স ৩০ করা হলে কোনো মহলের সুবিধা হয়, সার্বজনিন সুবিধা হয়না।

চেনেল আই অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*