জামিনেই প্রাধান্য বিএনপির

এই মুহূর্তে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। চেয়ারপারসনের যে ৪ মামলায় জামিন বাকি রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

আগামী সপ্তাহেই এসব মামলার জামিন শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনা আছে। বিরোধিতা না করলে সব কটিতেই চেয়ারপারসনের জামিন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। জামিনে মুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে নেয়া হতে পারে।

এদিকে খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেই শপথ নিতে পারেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত ছয় সংসদ সদস্য। পর্দার আড়ালে এমন সমঝোতাই হচ্ছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব বিশ্লেষণ করে বিএনপির নেতারা মনে করেন, রাজপথের কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে চেয়ারপারসনকে মুক্ত করা কঠিন। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তার কারামুক্তি সম্ভব নয়। সমঝোতার ক্ষেত্রে ৬ এমপির শপথের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ৬ এমপি শপথ নিলে জাতীয় সংসদে সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। এ ইস্যুতে সরকার কিছুটা ছাড় দিতেই পারে। অন্যদিকে ৬ এমপির শপথের বিষয়ে বিএনপির ওপর সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের চাপও আছে।

এ ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকেও ছাড় দেয়া হতে পারে। এ অবস্থায় চেয়ারপারসনের মুক্তি এবং ৬ এমপির শপথ ঘিরে উভয় পক্ষের সমঝোতা হতে পারে বলেই তারা মনে করেন।

দলের একটি সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব না হলে প্যারোলের বিষয়টিও ভাবা হতে পারে। এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা ইতিবাচক। তারা চাচ্ছেন যে কোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সুচিকিৎসা।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ৪টি মামলা থাকলেও জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চেরিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দুটিই মূলত বড়। দুটি মামলায় চেয়ারপারসনের জামিনের বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকার যদি বাধা সৃষ্টি না করে তাহলে চেয়ারপারসনের জামিন না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এ দুটি মামলায় জামিন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, সরকারই খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বাধা দিচ্ছে। সরকার যদি বাধা না দেয় তাহলে দু’দিনের মধ্যেই তিনি মুক্তি পাবেন। সরকার দুদক আর অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলে দিক, তারা যেন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনে বাধা না দেন, তাহলেই তিনি মুক্তি পাবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও একই মন্তব্য করেন।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমাদের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো জামিনযোগ্য। জামিন তার প্রাপ্য অধিকার। আমরা চাই জামিনের মধ্য দিয়ে চেয়ারপারসন মুক্ত হয়ে আসুক।

সূত্র জানায়, রোববার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির মহাসচিবসহ তিন নেতা। সেখানে প্যারোলে মুক্তি ও শপথের বিষয়ে কথা বলেন তারা। তবে তাতে রাজি নন বিএনপির চেয়ারপারসন।

সূত্র জানায়, সাক্ষাতে খালেদা জিয়ার মনোভাব জেনে তার জামিনে মুক্তির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন বিএনপির নেতারা। সেক্ষেত্রে ছয় এমপির শপথের শর্তে জামিনে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। আর এটি হলে এ মাসেই মুক্তি পেতে পারেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যা কিছু হতে হবে তা এ মাসের মধ্যেই। কারণ, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ছয় এমপির শপথ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সমঝোতা হলেও তা দ্রুত শেষ করতে হবে। শপথ নিতে আগ্রহী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা।

দলের মহাসচিব ছাড়া নির্বাচিত অন্য পাঁচ এমপি জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নেয়ার ব্যাপারে এলাকার জনগণের চাপ আছে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে তারা যাবেন না।

সূত্র জানায়, গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বিএনপির নির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে ফোনে কথা বলে শপথের ব্যাপারে নানা প্রলোভন দিচ্ছেন। বিষয়টি জানতে পেরেই দ্রুত এমপিদের নিয়ে বৈঠকে বসেন মির্জা ফখরুল। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করা যাবে না বলে তাদের সতর্ক করে দেন।

শপথসহ পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ফের বৈঠক করতে পারেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলে ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত হতে পারে শপথের দিনক্ষণ।

জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে নির্বাচিত এমপি জাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের মতামত জানতেই মূলত দলের নীতিনির্ধারকরা বৈঠক ডাকেন। সেখানে আমরা মত দিয়েছি। শপথ নেয়ার বিষয়ে এলাকার জনগণের ভীষণ চাপ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ছয় এমপির শপথের শর্তে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে। দলের একটি অংশ সমঝোতার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তিতে সম্মত নয়। তারা মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিএনপির পরাজয় হবে।

বিশেষ করে খালেদা জিয়ার আপসহীন নেত্রী হিসেবে যে সুনাম রয়েছে তা থাকবে না। যেসব নেতা সমঝোতার সঙ্গে জড়িত তাদের নানা মাধ্যমে এমন বার্তা দিচ্ছে ওই অংশটি। শেষ পর্যন্ত ছয় এমপি শপথ নিলে এ নিয়ে দলের মধ্যে বিভাজন প্রকাশ্য হতে পারে বলেও আশঙ্কা অনেকের।

আবার দলের একটি অংশ মনে করে, শপথ নেয়ার সঙ্গে যদি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হয় তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কেননা খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে বিএনপির রাজনীতি গতি পাবে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে থাকা মোট ৩৬ মামলার মধ্যে সাজা হয়েছে দুটিতে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেয়ার পর হাইকোর্টে সাজা বেড়ে হয় ১০ বছর। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে ৭ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন নিু আদালত। বাকি ৩৪ মামলার মধ্যে গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ ১৩টি মামলা বিচারাধীন।

আর হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে ২১ মামলা। সর্বশেষ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে আটজনকে হত্যার মামলায় ৬ মার্চ খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। খালেদা জিয়ার মুক্তি পেতে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাসহ মোট চারটি মামলার জামিন বাকি আছে।

বিএনপির একজন আইনজীবী বলেন, কার্যতালিকায় খালেদা জিয়ার মামলা দ্রুত আসাটা অনেকটা সরকারের ওপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে চাইলে যে কোনো সময় এ জামিন শুনানি হতে পারে।

ওই আইনজীবী আরও বলেন, এটা অনেকটা রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়। বিএনপি ও সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলে এসব মামলায় দু’দিনেই খালেদা জিয়া জামিন পেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*