ঈদে তৃণমূলের পাশে ছিলেন না নেতারা

জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম ঈদে তৃণমূলের পাশে নেই নেতারা। নির্বাচনে আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পদচারণায় মুখর ছিল অজপাড়াগাঁ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব কর্মী-সমর্থক দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করেছেন এবারের ঈদে তাদের পাশে প্রায় কেউই দাঁড়াননি। ভোটের পর কয়েক মাসেই পাল্টে গেছে সেই চিত্র।

তৃণমূলের খোঁজখবর না নিয়ে নেতারা কেন্দ্রের প্রভাবশালী নেতাদের তোষামোদে ব্যস্ত। অনেকেই আবার পরিবারকে সময় দেয়া নিয়ে সময় পার করেছেন। নেতাকর্মীদের এড়িয়ে চলতে অনেক নেতা ঈদের আগেই ফোন বন্ধ রাখেন।
কেউ আবার ওমরাহ হজ করতে গেছেন সৌদি আরব। অনেকে পুরো পরিবার নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পাড়ি জমান বিদেশে। দেশের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চিত্রও প্রায় একই। অথচ ঈদের আগে তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতে দলগুলোর হাইকমান্ড থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ নেতাই এলাকায় গিয়ে হাইকমান্ডের সেই নির্দেশ পালন করেননি। তাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ তৃণমূল।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভিড় জমে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে প্রায় নয় হাজার মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়। নির্বাচনের আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নিয়মিত তাদের নির্বাচনী এলাকা সফর করেন। খোঁজ নেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের। কোনো নেতাকর্মী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকলে সেখানেই ছুটে গেছেন। অনেকেই নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। কারও কোনো সমস্যা থাকলে তাৎক্ষণিক তা সমাধান করে দিয়েছেন। নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভোটের আগে গত ঈদুল আজহায় তৃণমূলে তাদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। সে সময় ভোট সামনে রেখে অনেকেই দীর্ঘদিন পর এলাকায় গেছেন। শুধু এমপি-মন্ত্রীরাই নন, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অধিকাংশই ঈদ উদযাপন করেছেন গ্রামে। তাদের পদচারণায় জমে উঠেছিল ঈদ রাজনীতি। ঈদ বকশিশের নামে অনেককেই নগদ টাকা দিয়েছেন। এলাকায় প্রভাব রয়েছে, এমন নেতাদের কাছে টানতে তাদের বকশিশের পরিমাণও ছিল বেশি। কিন্তু এবার ঈদের চিত্র পুরো উল্টো। নির্বাচনের পর বেশির ভাগ এমপি, কিছু মন্ত্রী এবং পরাজিত প্রার্থীদের অধিকাংশই এলাকায় যাননি।

বিগত সময়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ছবি সংবলিত বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুনে এমনকি মোবাইলেও এসএমএস পাঠিয়ে তাদের উপস্থিতি জানান দিলেও এবার তা দেখা যায়নি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন না। নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। নির্বাচনের সময় ভোট পাওয়ার আশায় নেতাকর্মীদের কাছে ছুটে আসেন। কিন্তু এখন তো নির্বাচন নেই তাই আমাদের আর প্রয়োজন নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতারা এলাকায় আসেন ভোটের আশায়। তারা নেতাকর্মী ও জনগণের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য। কিন্তু ভোটের মৌসুম পার হয়ে গেছে।

তাই জনসম্পৃক্ততার কথাও ভুলে গেছেন। তাছাড়া এখন তো এমপি-মন্ত্রী হতে ভোটের প্রয়োজন নেই। দেশে এখন প্রকৃত রাজনৈতিক দল নেই দাবি করে মজুমদার বলেন, এখন স্বচ্ছ রাজনীতির চর্চাও হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করে। নিজের সুবিধা দেখে, জনগণের নয়। যেহেতু ভোটারের চেয়ে দলীয় প্রতীকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাই কেন্দ্রীয় নেতাদের তোষামোদীই প্রাধান্য পাচ্ছে। তাদের ছেড়ে ভোটারের কাছে যাওয়া এসব নেতার কাছে নিষ্প্রয়োজন মনে হয়।

গত ঈদুল আজহায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে তৃণমূল ছিল সরব। কিন্তু এবার ফাঁকা। ব্যানার-ফেস্টুন, পোস্টারে এলাকার অলিগলি ছেয়ে থাকলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রায় কোথাও ঈদ শুভেচ্ছার পোস্টার খুঁজে পাওয়া যায়নি। তেমন কেউ পায়নি এসএমএস। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে গত বছরের মতো এবার কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় নেতাদের নিয়ে কোথাও জটলা লক্ষ্য করা যায়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশই এবার ঢাকায় ঈদ করেছেন। এমপি-মন্ত্রীরাও নির্বাচনের আগের ঈদের মতো এবারের ঈদে এলাকায় সময় দেননি। দলীয় নেতাকর্মীদেরও তেমন সহযোগিতা করেননি।

প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদ, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান ঢাকায় ঈদ করেন। ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ঢাকায় ঈদ করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে মাহবুবউল আলম হানিফ কানাডায়, ডা. দীপু মনিও এবার দেশের বাইরে ঈদ করেছেন। আবদুর রহমান ঈদ উদযাপন করেছেন যুক্তরাজ্যে।

আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ ঈদ উদযাপন করেন দেশের বাইরে। বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ঈদ করেছেন ঢাকায়। কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী ঢাকায় ঈদ উদযাপন করেন।

এ প্রসঙ্গে মতিয়া চৌধুরী শনিবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ঈদের আগেই আমি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে এসেছি। তাদের খোঁজখবর নিয়েছি। নকলা উপজেলায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। এখন সেখানে থাকলে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন হতে পারে। কাজেই এবার ঈদের সময় আমি ঢাকায় ছিলাম।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে চার হাজার ২৩ জন নেতা ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন নিয়ে সে সময় নিজ এলাকায় তুমুল প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতেও এবার তাদের অধিকাংশই এলাকায় যাননি। রমজানের সময় খোঁজ নিলেও ঈদে ছিলেন অনুপস্থিত।

জানতে চাইলে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান যুগান্তরকে বলেন, যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তাদের অনেকে এবার ঈদ করতে এলাকায় আসেননি। ভোট সামনে রেখে হয়তো গত ঈদে নেতারা এলাকায় এসে তৃণমূলের খোঁজখবর নিয়েছেন। এখন তো ভোট নেই তাই হয়তো তারা আসার প্রয়োজন মনে করেননি।

গত নির্বাচনে ধানের শীষের টিকিট পাওয়ার জন্য হাজার হাজার নেতা মাঠে নামেন। ৪ হাজার ৫৮০টি দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি, শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি অঙ্গদল এবং বিশেষ করে জেলা কমিটিগুলো গঠনের সময় পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া ঈদুল ফিতরে এসব নেতার বেশির ভাগের চেহারাই দেখেননি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে মামলা-হামলা, গ্রেফতার-হয়রানিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের জীবনে উঠেছে নাভিশ্বাস। অথচ তাদের পাশে নেই তারা। ঈদের আগে থেকেই তাদের মোবাইল বন্ধ। অনেকে গেছেন ওমরাহ হজ করতে, কেউ আবার চিকিৎসার নামে গেছেন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সাধারণত ঈদের আগে ওমরাহ করতে যান না। নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি এবার ওমরাহ করতে সৌদি আরব গেছেন। এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণবঙ্গে বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা রয়েছেন। মেজর হাফিজউদ্দিন, সারফুদ্দিন আহমেদ সান্টুসহ অনেকেই যাননি এলাকায়। চাঁদপুর-১ আসনে সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে বাদ দিয়ে মোশাররফ হোসেনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এ নিয়ে দলের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। নির্বাচন শেষ করেই মোশাররফ হাওয়া। ঈদের আগে ও পরে তিনি এলাকায় যাননি। নেতাকর্মীরাও তার কোনো খোঁজ পাননি।

জানতে চাইলে যুবদল কেন্দ্রীয় ও ফরিদপুর সদরের বিএনপি নেতা মাহবুবুল হাসান ভুইয়া পিংকু যুগান্তরকে বলেন, জেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এমনকি কেন্দ্রীয় এক ভাইস চেয়ারম্যানসহ সিনিয়র নেতারা কেউ এলাকায় আসেননি। বড় বড় পদ নিয়ে বসে আছেন অথচ নেতাকর্মীদের পাশে নেই তারা।

অসুস্থ ও গরিব নেতাকর্মীদের সহায়তা দূরে থাক তাদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাটুকুও বিনিময় করেননি। উল্টো অনেকে ফোন বন্ধ করে রাখেন। অথচ নির্বাচন ও দলীয় পদ নেয়ার সময় তাদের ভিড়ে ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা জায়গা পান না। দলের হাইকমান্ডকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ও পটুয়াখালী-৪ থেকে মনোনয়প্রাপ্ত এবিএম মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ঢাকায় ঈদ করেছি। তবে ঈদের আগে এলাকা ঘুরে এসেছি। নির্বাচনী এলাকায় দুস্থ ও অসহায় নেতাকর্মীদের সাধ্যমতো সহায়তা করেছি। নানা মাধ্যমে তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি। আরও অনেক নেতাই যুগান্তরের কাছে এ ধরনের কথাই বলেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*