সংসদে ছড়াতে পারে রাজনৈতিক উত্তাপ

সংসদে এবার কিছুটা হলেও রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে পারে। সর্বশেষ বিএনপির ছয়জন সংসদ সদস্যের শপথ নেয়া ও সংসদে যোগ দেয়ার পর আসন্ন অধিবেশনকে সামনে রেখে এমনটিই মনে করা হচ্ছে। যদিও বিএনপির এই সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দেয়া নিয়ে দল ও জোটের মধ্যেই চাপা অসন্তোষ রয়েছে। তাদের সংসদে ভূমিকা পালনের বিষয় নিয়েও জোটে আলোচনা নেই বললেই চলে। কাল মঙ্গলবার থেকে চলতি সংসদের তৃতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। আগামী ১৩ জুন সংসদে বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে।

চলতি একাদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলাকালে গত ২৯ এপ্রিল নানা জল্পনা কল্পনার মধ্যেই বিএনপির চারজন সংসদ সদস্য শপথ নেন ও সংসদের বৈঠকে যোগ দেন। তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই সংসদে যোগ দেন বলে জানানো হয়। তার আগে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে অপর এক বিএনপি সংসদ সদস্য শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। এ জন্য তাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল।

বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্ধারিত ৯ দিনের মধ্যে শপথ না নেয়ায় তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয় গত ৩০ এপ্রিল। আসনটিতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সর্বশেষ সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সিদ্ধান্তে অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গতকাল রোববার তিনিও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট গত নির্বাচনে জোটগতভাবে নির্বাচন করে। বিএনপির সদস্যদের আগে ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের দুইজন সংসদ সদস্যও দলের তখনকার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিয়েছিলেন।

গত ২৯ এপ্রিল সংসদে যোগ দেয়ার পর বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ একাদশ সংসদ নির্বাচন ও সংসদ নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই অবস্থা থেকে দেশের মানুষকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে কিছুটা আপত্তি ওঠলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই সংসদে আসতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, দলকে বুঝাতে হয়েছে।’

অবশ্য পরদিন ৩০ এপ্রিল অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। ফলে বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে সেভাবে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে এখন সংরক্ষিত নারী আসনের একজনসহ মোট ছয়জনের সংসদে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে, বাজেট বক্তব্য এবং বিভিন্ন নোটিশের মাধ্যমে বক্তব্য রাখার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মনে করছেন। বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার কথা প্রথম অধিবেশন থেকেই বলে আসছেন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গতকাল শপথ নেয়ার পরই সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আমি এমন একটি সংসদে যোগ দিতে যাচ্ছি যে সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না। সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকেই বলেছি, এটি অবৈধ সংসদ, এখনো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছি, এটি অবৈধ সংসদ। আমি খুব খুশি হবো যদি আমার সংসদ সদস্য হওয়ার মেয়াদ এক দিনের বেশি না হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি চাই দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হোক।’ তিনি বলেন, আমরা সংখ্যাগত দিক থেকে নিশ্চয়ই অনেক কম। তার পরও আশা করছি, সংসদে যদি একজনও ন্যায্য কথা বলেন, তাকে যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেয়া হবে। সরকারের স্বার্থেই সংসদে সময় ও সুযোগ দেয়া উচিত।’ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তার মামলার মেরিট, তার বয়স, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় তিনি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক জামিন লাভের যোগ্য। তাকে জামিন বঞ্চিত করে কারাগারে রাখা হয়েছে। যার পুরোটাই বেআইনি। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। নিশ্চয়ই সেই বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে কথা বলব।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতঃপূর্বে বলেছেন, কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। নতুন নির্বাচনের দাবি আদায় ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সংসদের ভেতরে-বাইরে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

বিএনপি সংসদে যোগ দিলেও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। ফলে বর্তমানে সংসদে ছয় আসন নিয়ে বিএনপি সংসদে অন্যতম বিরোধী দল হিসেবেই বিবেচিত হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবৈধ আখ্যায়িত করে বিএনপি নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবি করে আসছিল। এরই মধ্যে নানা নাটকীয়তা মধ্যে দল ও জোটের সাতজন সংসদ সদস্য শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেয়ায় দলে চাপা অসন্তোষও রয়েছে। তবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই আকর্ষিক সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়ার পর এ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকছেন সর্বস্তরের নেতাকর্মী।

যদিও গত রমজান মাসে বিভিন্ন ইফতার তাহফিল এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীর আলোচনায় অংশ নিয়ে অনেকে দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি বিরূপ মন্তব্যও করেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গত ৩১ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাঁতীদল আয়োজিত এক আলোচনা সভায়ায় প্রকাশ্যেই বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়া ও সংসদে যাওয়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দলীয় সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দেয়ার ব্যাপারে চাপের চেয়েও তাদের লোভই বেশি কাজ করেছে।

গত ৩০ মে এনডিপি আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বিএনপির সংসদ সদস্যদের নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে নিজেদের সমালোচনা করে বলেন, আমাদের এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ লোক গুম এবং হাজার হাজার নেতাকর্মী জেল জুলুমের শিকার হলেও আমাদের চেয়ারপারসন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য আমরা কেউ রাজপথে জীবন উৎসর্গ করিনি, আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি, কেউ জেলে যাইনি। আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিএনপি সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দেয়া নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। যদিও এখন বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা-সমালোচনা কম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির প্রভাবশালী একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে সত্যিকার অর্থে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তো নেই। নেই মানে চালাতে দেয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় এই কয়জনের সংসদে যোগ দেয়া না দেয়ায় কী আসে যায়। তারা সংসদে যেতে চেয়েছে, দল শেষ পর্যন্ত যেতে বলেছে। পরে তারাই দেখবে যে, গিয়ে তারা কী পেলো আর কী পেলো না।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য এ ব্যাপারে বলেন, সংসদের বাইরে আন্দোলনের কারণেই মির্জা ফখরুল ইসলাম শপথ নেননি, যোগ দেননি। যারা যোগ দিয়েছেন তারা রাজপথের দাবি-দাওয়া নিয়ে সংসদে কথা বলার কথা বলবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিএনপির ছয়জনসহ ঐক্যফ্রন্টের সদস্যদের সংসদে যোগ দেয়া নিয়ে আশাব্যাঞ্জক কোনো মন্তব্য না করলেও সংসদের ফ্লোরে রাজনৈতিক ইস্যুগুলো তুলে আনার চেষ্টা তারা করতেই পারেন এবং সে ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে সংসদে উত্তাপও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন।

সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের আটজন ও চারজন স্বতন্ত্র সদস্য বাদ দিলে অন্য সব সদস্যই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ঐক্যবদ্ধভাবে করার পর সরকার গঠনের সময় ২৬ আসন নিয়ে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে রয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি প্রথম অধিবেশন শুরুর মধ্য দিয়ে বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*