সচিবের জন্য অপেক্ষায় ৩ ঘণ্টায় ছাড়েনি ফেরি, অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন নড়াইলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় আনা হচ্ছিল। কিন্তু নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের গাড়ি না আসায় ফেরি ছাড়তে তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়।

এ অবস্থায় ঘাটে ফেরি ছাড়ার অপেক্ষায় অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হয় স্কুলছাত্র তিতাসের। মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১নং ফেরি ঘাটে বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) রাতে এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাতে অনেক অনুরোধের পরও কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া হয়নি।


এমনকি জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও প্রতিকার মেলেনি। এদিকে, কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ফেরি কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে অসুস্থ স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

রোববার সকালে বিআইডব্লিউটিএর সচিব প্রণয় কান্তি বিশ্বাস কাঁঠালবাড়ি ঘাট ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম মিয়ার কাছে মুঠোফোনে ঘটনার সত্যতা জানতে চেয়েছেন।

একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে সচিবের জন্য অপেক্ষমান ভিআইপি ফেরি কুমিল্লায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে উঠতে না দেয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান খোঁজখবর নিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের ম্যানেজার আব্দুস সালাম মিয়া। আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘাটে দায়িত্বে ছিলেন বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন।

ওই দিন বিকেলে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক আমাকে মৌখিকভাবে ভিআইপি (অতিরিক্ত সচিব) পারাপারের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ওই অতিরিক্ত সচিবের নাম আমার জানা নেই।

বৃহস্পতিবার রাতে ফেরিঘাটে দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ব্যবস্থাপক ফিরোজ হোসেন বলেন, আমি তখন অন্য ঘাটে ছিলাম। খবর পেয়ে ওই অতিরিক্ত সচিবকে ফেরিতে উঠানোর জন্য ঘাটে আসি।

রাত ১০টার দিকে সাংবাদিক পরিচয়ে এক ব্যক্তি রোগীবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে উঠানোর অনুরোধ করেন। আমি সচিবের গাড়ির সঙ্গে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি রাত ১১টার দিকে ফেরিতে উঠিয়ে দেই।

পরে কি হয়েছে তা আমি জানি না। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিরিক্ত সচিবের গাড়ির অপেক্ষায় প্রায় তিন ঘণ্টা ফেরি ঘাটে থাকায় প্রাণ গেলো অ্যাম্বুলেন্সের রোগীর।

ওই দিন আশপাশের লোকজনের অনুরোধের পরও কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া হয়নি। অথচ রাত ৮টায় কাঁঠালবাড়ি ১নং ফেরিঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন কুমিল্লা নামের ফেরিটি ঘাটেই ছিল।

কিন্তু ওই কর্মকর্তার গাড়ি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়তে রাজি হয়নি ঘাট কর্তৃপক্ষ। কারণ ওই কর্মকর্তার ভিআইপি গাড়ি যাওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক।

এ অবস্থায় রোগীর স্বজনরা ফোন করেন জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে। সাহায্য চান ঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের। কিন্তু কারও কোনো অনুরোধই রাখেনি ঘাট কর্তৃপক্ষ।

প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত পৌনে ১১টার দিকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো সাদা রঙয়ের নোহা মাইক্রোবাসটি ঘাটে আসার পর রাত ১১টার দিকে ফেরি ছাড়া হয়।

তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মস্তিস্কে প্রচুর রক্তক্ষরণে আম্বুলেন্সেই মৃত্যু হয় স্কুলছাত্র তিতাসের। তবে ভিআইপি কর্মকর্তার জন্য ফেরি দেরিতে ছাড়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেল ঘাট কর্তৃপক্ষ।

মৃতের স্বজনরা জানান, ঘাটে সবার সহযোগিতা চেয়েছি। অনুরোধ করেছি ফেরি ছাড়ার। পুলিশ এবং ঘাট কর্তৃপক্ষ বার বার জানিয়ে দিল ভিআইপি আসবে, তারপর ফেরি ছাড়া হবে।

রাত ৮টার ফেরি ছাড়ল রাত ১১টায়। ততক্ষণে মৃত্যু হয় রোগীর। তিতাস মারা যাওয়ায় ঢাকার দিকে না গিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে বাড়ির দিকে অ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে দেয়া হয়। এই মৃত্যুর জন্য ওই ভিআইপি ও বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা দায়ী। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।

নিউজ১২/নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*