বিএনপির তৃণমূল পুনর্গঠনে অবস্থা

বিএনপির তৃণমূল কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি জেলায় তৃণমূল নেতাদের মতামত উপেক্ষা করে কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আবার কোথাও সদস্য সচিব করা হয়েছে যাকে স্থানীয় নেতারা চেনেন না। অধিকাংশ জেলা কমিটিতে সিনিয়র নেতাদের রাখা হয়েছে জুনিয়র নেতাদের নিচে। যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে অনেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন, কেউ কেউ বিদেশেও পাড়ি দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, পুনর্গঠন ইস্যুতে কেন্দ্র থেকে বারবার নতুন করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে পারবেন না- এমন বিধান করেছে হাইকমান্ড। কিন্তু এক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে দুই ধরনের নির্দেশনা যাচ্ছে।

কোনো কোনো জেলা কমিটি গঠনে বলা হয়েছে শুধু আহ্বায়ক-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটির শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন না, কিন্তু সদস্য সচিব পারবেন। আবার কোথাও বলা হয়েছে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব উভয়েই প্রার্থী হতে পারবেন না।
সব মিলিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ। তারা মনে করেন, শুধু পকেট কমিটি করার জন্য দুই জেলার জন্য দুই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। না হলে তৃণমূলে ভুল বার্তা যাবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটির মধ্যে অধিকাংশ কমিটি ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটি গঠনের কাজ চলছে।
সেখানে দ্রুতই নতুন কমিটি করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দু-একটি অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে যেসব জেলার কমিটি হয়েছে সেখানে দলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের মোট ৮২টি সাংগঠনিক জেলা শাখার মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ৩৩ জেলার নতুন কমিটি ইতিমধ্যে গঠন করেছে বিএনপি। এর মধ্যে মাদারীপুর জেলা কমিটি কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জেলার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করছে।

এর কারণ জানতে চাইলে মাদারীপুর জেলার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহান যুগান্তরকে বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা ছিল ঢাকার লোকজনদের কমিটিতে না দেয়ার জন্য। পরে জেলার মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সমন্বয়ে আমরা একটি কমিটি কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম।

কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ৪৩ সদস্যদের যে আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে এর মধ্যে বেশির ভাগই মাঠের নেতা নন। তিনি আরও বলেন, সব জেলা আর মাদারীপুর জেলা এক নয়। আমাদের এখানে আগুনের মধ্যে থেকে রাজনীতি করতে হয়।
সেখানে আমাদের ছাড়া যদি কেন্দ্রের কথা অনুযায়ী চলে তাহলে মাদারীপুরে রাজনৈতিকভাবে কিছুই করা যাবে না।

রাজশাহী জেলা কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয়েছে বিশ্বনাথ সরকারকে। যাকে স্থানীয় নেতারা অনেকেই চেনেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আবু সাঈদ চাঁদকে আহ্বায়ক করেছে ঠিক আছে। তিনি কর্মীবান্ধব ও রাজপথের নেতা।

কিন্তু যাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে আমার রাজনীতির ১৪ বছরে তাকে মিছিল মিটিংয়ে খুব একটা দেখিনি। তিনি নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত নন। অথচ আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টুকে সদস্য করা হয়েছে।
এই মন্টু রাজনীতিতে এসে অনেক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। আশির দশকে তাকে দেখতে খালেদা জিয়া তার বাসায়ও গিয়েছিলেন।
পাবনা জেলা কমিটিতে সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে সদস্য সচিব করা হয়েছে। তিনি কমিটিতে থাকা নেতাদের মধ্যে জুনিয়র। এর আগে ছাত্রদলের জেলা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আহ্বায়ক কমিটির এক নেতা জানান, সিদ্দিক অনেক জুনিয়র। তার রাজনীতি কেবল শুরু। তিনি রাজনীতিতে অনেক দূর যেতে পারতেন।

কিন্তু এ বয়সে তাকে সদস্য সচিব করার ক্ষেত্রেও ষড়যন্ত্র রয়েছে। এর মাধ্যমে তার রাজনীতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কারণ কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, বিধান অনুযায়ী আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে পারবেন না।
এছাড়া জুনিয়র হিসেবে তাকে এ পদ দেয়ায় আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র নেতারাও ভালোভাবে নিচ্ছেন না। পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিবুর রহমান তোতা যুগান্তরকে বলেন, কমিটি করার ক্ষেত্রে সিনিয়র-জুনিয়র রাখার ক্ষেত্রে একটু এলোমেলো হয়েছে।

তবে এটি কোনো মারাত্মক ভুল বলব না। নাটোর জেলার আহ্বায়ক কমিটিতে সবচেয়ে সিনিয়র রাজনীতিবিদ গোলাম মোস্তফা নয়নকে রাখা হয়েছে সবশেষ সদস্য হিসেবে। অথচ তার রাজনীতি শুরু হয় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাগদলের নাটোরের বাগাতিপাড়া থানার সভাপতি হিসেবে।

অনেকটা অভিমান করে সম্প্রতি তিনি কানাডায় চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক নেতা।
নেত্রকোনা জেলা কমিটি অনুমোদন হলেও সমস্যার কারণে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সম্প্রতি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে অভিযোগ করেছেন, সাবেক ছাত্রদল নেতাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি ও শীর্ষ পদে যাদের রাখা হয়েছে তাদের সঙ্গে স্থানীয় তৃণমূলের কোনো সম্পর্ক নেই।
তাদের অভিযোগ, বিগত আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিলেন তাদের বেছে বেছে কমিটিতে রাখা হয়নি। যাদের রাখা হয়েছে তারা গত পাঁচ বছরে নেত্রকোনায় কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। অভিযোগ পেয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতারা সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কমিটি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল কাদের সুজা যুগান্তরকে বলেন, আমরা স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দলের মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবসহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সবাইকে জেলার প্রকৃত অবস্থা জানিয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা, সবার মতামতের ভিত্তিতে কমিটি হবে। না হলে জেলার নেতারা তা মেনে নেবে না।

নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক জিএস মাসুদ রানা চৌধুরী বলেন, আমরা চাই বিএনপি ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, সাবেক ভিপি, জিএসসহ যারা বিগত আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের সমন্বয়ে কমিটি দিতে হবে।
যারা নেত্রকোনায় থাকেন না, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই তাদের কমিটিতে রাখা হলে সেই কমিটি তৃণমূল মানবে না- এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, নেত্রকোনা জেলা কমিটি নিয়ে শেষ পর্যায়ের কাজ করছি।

অতিশিগগিরই আমরা ভালো খবর দিতে পারব। গোপালগঞ্জ জেলা কমিটি ঘোষণার পরই নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ চলছে।। ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এনে যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান পিনু পদত্যাগ করেন। নতুন কমিটির আরও বেশ কয়েকজন পদত্যাগ করতে পারেন।
এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ জয়নাল আবেদিন মেজবাহকে জেলা আহ্বায়ক কমিটির ৬ নম্বর সদস্য করায় তিনিও কমিটি গঠনে সন্তুষ্ট নন বলে জানা গেছে।

অনেকটা অভিমান করে নীলফামারী জেলার সাবেক সভাপতি আনিসুল আরেফিন চৌধুরী বলেন, ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে আমাকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। আর মূল্যায়ন দিয়ে কি হবে। কেন্দ্র যা ভালো মনে করেছে তাই করেছে।
এদিকে নতুন কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে পারবে না- হাইকমান্ড এমন নির্দেশনা দিলেও তা মানা হচ্ছে না। এ নিয়ে কেন্দ্র থেকে দুই ধরনের নির্দেশনা গেছে তৃণমূলে।

গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় বলা হয়েছে- শুধু আহ্বায়ক-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটির শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন না, কিন্তু সদস্য সচিব পারবেন। আবার পাবনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় বলা হয়েছে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব উভয়েই প্রার্থী হতে পারবেন না।
ফরিদপুর বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোপালগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, গোপালগঞ্জ জেলার ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে শুধু আহ্বায়ক-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি হতে পারবে না।

তবে জেনেছি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা কমিটি করার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব কেউই পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে পারবে না।
তৃণমূলের একাধিক নেতা জানান, দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জেলা কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এজন্য মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হচ্ছে। প্রথমে আহ্বায়ক কমিটি করা হচ্ছে, তারা ৩ মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার সব পর্যায়ের কমিটি করবেন।

পরে হবে জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আর জেলার নতুন কমিটি গঠনে সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের বেশির ভাগ নেতাই তাদের নিজেদের মতো করে কমিটি করছেন। অতীতে জেলা কমিটি করার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে অন্তত দশবার বৈঠক করে তাদের মতামত নিয়ে কমিটি করা হতো।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলায় দলের কেন্দ্রীয় যারা নেতা থাকেন তাদেরও মতামত নেয়া হতো। কিন্তু এখন দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকেই তা করছেন না। যে কারণে জেলা কমিটি পুনর্গঠনে তৃণমূল নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ উঠছে।