আন্দোলন হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে এবং দেশ শাসনে সর্বস্তরের জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে : আ স ম আবদুর রব

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের ধকল সামলে নতুন উদ্যমে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে কাজ করছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি। এ জন্য ১৬তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু করেছেন দলটির নেতারা। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ৩০ ডিসেম্বর হবে এ কাউন্সিল। তা ছাড়া দলের দশ দফা কর্মসূচি এবং চলতি ইস্যুতে রাজনৈতিক কর্মসূচিও অব্যাহত রেখেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক জেএসডি।

দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকেও শক্তিশালী করতে নানাভাবে তৎপর রয়েছেন জেএসডি নেতারা। বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে

নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে দ্রুত সরকারবিরোধী এ রাজনৈতিক ফ্রন্টকে আরও কার্যকর করতে চাইছেন তারা।

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব সমকালকে বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাইছেন তারা। চাইছেন স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করতে। গুম, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ব্যাংক লুট ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ আন্দোলন হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে, দেশ শাসনে সর্বস্তরের জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং জেএসডি অনুসৃত ১০ দফা ও ১৪ দফার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী।

আ স ম আবদুর রব বলেন, ঘরে বসে আন্দোলন করলে গণতন্ত্রের মুক্তি সম্ভব নয়। কোনো একক দলের পক্ষে আন্দোলন করে এই সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। তাই সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

প্রতিষ্ঠা ও ভাঙন :আওয়ামী লীগভুক্ত বাম চিন্তাধারার একাংশ ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) আবদুল জলিলকে আহ্বায়ক করে এ দলের সাত সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছর অনুষ্ঠিত প্রথম কাউন্সিলে মেজর (অব.) আবদুল জলিল সভাপতি এবং আ স ম আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সিরাজুল আলম খান ছিলেন জাসদ প্রতিষ্ঠার নেপথ্য নায়ক।

তবে জাসদ বেশিদিন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি। ১৯৮০ সালের নভেম্বরে জাসদের প্রথম ভাঙনের মধ্য দিয়ে খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) গঠিত হয়। নানা ভাঙা-গড়ার পর ১৯৯৭ সালে জাসদের বিভিন্ন ধারা আবারও একত্রিত হয়ে আ স ম আবদুর রবকে সভাপতি ও হাসানুল হক ইনুকে সাধারণ সম্পাদক করে ঐক্যবদ্ধ জাসদ গঠন করে। কিন্তু আ স ম রবের ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনসহ আদর্শিক দ্বন্দ্বের জের ধরে ২০০২ সালের অক্টোবরে ঐক্যবদ্ধ জাসদ আবারও দুটি ধারায় বিভক্ত হয়। একই বছর রবের নেতৃত্বাধীন অংশের কাউন্সিলে নূর আলম জিকুকে সভাপতি ও আবদুল মালেক রতনকে সাধারণ সম্পাদক করে জাসদকে পুনর্গঠন করা হয়। ২০০৫ সালের কাউন্সিলেও এ নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকে। তবে ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন তালিকায় জিকুর নেতৃত্বাধীন অংশকে জেএসডি এবং হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন দলকে জাসদ নামে নিবন্ধিত করা হয়।

এদিকে সাবেক মন্ত্রী আ স ম আবদুর রব প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন ধারা চালু করতে ইউনিটি ফর পলিটিক্যাল রিফর্ম (ইউপিআর) গঠন করেন। সেখান থেকে আবারও ২০০৯ সালে জেএসডির হাল ধরেন রব। সে বছরের কাউন্সিলে আ স ম আবদুর রব জেএসডির সভাপতি এবং আবদুল মালেক রতন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১২ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলেও তা অপরিবর্তিত থাকে।

২০০২ সালে বিভক্ত জাসদের অপরাংশ হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। তবে জাসদের এ অংশেও ২০১৬ সালে ভাঙন দেখা দেয়। তখন থেকে শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে একটি অংশ বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) নামে কার্যক্রম শুরু করে। তিন খণ্ডে বিভক্ত ঐক্যবদ্ধ জাসদের মধ্যে জেএসডি বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে এবং জাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে সক্রিয় রয়েছে।

সাংগঠনিক তৎপরতা :জেএসডি বর্তমানে সিরাজুল আলম খানের ভাবাদর্শ ও তার ১৪ দফা আদর্শের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০ দফা সংস্কার আন্দোলন করছে। এই দশ দফায় রয়েছে দুই কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও ফেডারেল সরকার গঠন, নয়টি প্রদেশ, প্রাদেশিক পরিষদ ও প্রাদেশিক সরকার গঠন, স্ব-শাসিত উপজেলা প্রতিষ্ঠা, উপজেলা ও পৌরসভাকেন্দ্রিক প্রবাসীদের অর্থায়নে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, নগর সরকার গঠন, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন ইত্যাদি।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জেএসডি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে জেএসডির চারজন এবং দলীয় প্রতীক ‘তারা’ নিয়ে আরও ১৩ প্রার্থী এ সময় ভোটের লড়াইয়ে নামেন। যদিও কোনো আসনে জয়ী হতে পারেনি এ দল।

আগামী ৩১ অক্টোবর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে ঘিরে এখন জেএসডির নেতাকর্মীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ ছাড়া আগামী ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে জেএসডি। জাতীয় কাউন্সিলের আগে চলতি মাসের মধ্যে দলটির ৫৫টি সাংগঠনিক জেলাসহ উপজেলা, থানা, পৌর ও শিল্পাঞ্চল কমিটিকে পুনর্গঠনের কার্যক্রম শেষ করার প্রত্যাশা করছেন এ দলের নেতাকর্মীরা। দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক জোট, জাতীয় যুব পরিষদ এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগকেও শক্তিশালী করতে জেএসডি পদক্ষেপ নিচ্ছে।

দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, তাদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছেন। তা ছাড়া একাদশ জাতীয় নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবিসহ ডেঙ্গু, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট বন্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছেন তারা।

যুগ্ম সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, আগামী ডিসেম্বরের জাতীয় কাউন্সিলকে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। তার আগে জেলাসহ অন্যান্য কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে পুনর্গঠন কার্যক্রমও শুরু করেছেন তারা।

সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সামনে রেখে দলকে শক্তিশালী করতে চাইছেন তারা। পাশাপাশি গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে সব দল ও মতকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেও নামতে চাইছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*