ছাত্রদলের কাউন্সিল প্রসঙ্গে ফখরুল: স্থগিতাদেশে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, ছাত্রদলের কাউন্সিলের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে। এ ঘটনা নজিরবিহীন। ছাত্রদলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই নিয়েছেন। আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ লিগ্যাল (বৈধ)। এখন পর্যন্ত যা হয়েছে কোনোটাই বেআইনি হয়নি, সবকিছুই আইনসম্মতভাবে হয়েছে।

শুক্রবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সিনিয়র আইনজীবীদের বৈঠকের পর বিএনপির মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক হয়।
ছাত্রদলের কাউন্সিলের বিষয় কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব বলেন, এটি ছাত্রদলের বিষয়। এ বিষয়ে তারা আলোচনা করছে। তাদের (ছাত্রদল নেতারা) সিদ্ধান্ত তারা নেবে। বিএনপি এর সঙ্গে কোনো মতেই জড়িত নয়।

বিএনপিকে আদালত যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে তার জবাব দেব- এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যেমন আমাদেরকে পক্ষ করা হয়েছে। আমরা আমাদের উত্তরগুলো আদালতের কাছে যথাসময়ে দেব। সেই ব্যবস্থা নেব। তবে ছাত্রদলের সিদ্ধান্ত ছাত্রদলই নেবে, এখন যারা দায়িত্বে আছেন, তারাই বলবেন।

বিএনপির মহাসচিব প্রশ্ন রেখে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে সবার অগোচরেই আদালতের এ স্থগিতাদেশ এসেছে। এতে বোঝা যায়, এখানে সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপ আছে। হস্তক্ষেপ আছে বলেই এ স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার আছে, তারা নির্বাচিত সরকার নয়। তাদের জবাবদিহিতা নেই, তারা কী চান? তারা কি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের একটা ন্যূনতম পরিবেশ-পরিস্থিতি থাকুক, সেটা তারা চান না। দুঃখজনকভাবে তারা ব্যবহার করছেন আদালতকে। যেটা কখনোই কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, জাতির ভবিষ্যতের জন্য শুভ হতে পারে না।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, আজ বর্তমান সরকার যে একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছেন, এই সংস্কৃতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আদালতকে দিয়ে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেটা আমি মনে করি অত্যন্ত ভয়াবহ একটা বিষয়।
তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ করলাম যে, গত ১০ বছর এই কাজটি তারা এখানে করলেন। তারা আদালতকে দিয়ে ‘কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট সিস্টেম’- যেটা শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়, সেখানে একটা আশা-আকাক্সক্ষার স্থান ছিল যে, একটা দিন (ভোটের দিন) অন্তত আমরা ভোটটা দিতে পারব। এটা তাদেরই (আওয়ামী লীগ) নিয়ে আসা, তারাই এই ‘কেয়ারটেকার’ ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিলেন, তারাই আবার আদালতকে ব্যবহার করে কেয়ারটেকার সিস্টেম থেকে সরে গেলেন। দেশ ও জাতিকে স্থায়ীভাবে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার দিকে তারা ঠেলে দিলেন। যেটা দেশনেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন- তা আজ প্রমাণিত হল।

মির্জা ফখরুল বলেন, এ সরকার আদালতকে ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন রকমের আইনকানুন তৈরি করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। বিগত নির্বাচনের সময় আপনারা দেখেছেন যে, কতজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে দিয়েছে। কীভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়া হয়েছে। যেটা আইনের মধ্যে একরকম আছে সেটাকে আদালতের মাধ্যমে বাতিল করে দেয়া হয়েছে। মেয়রদের বেলায় আইনে বলা আছে, তারা নির্বাচন করতে পারেন, তবে নির্বাচিত হলে তারা পদ ছেড়ে দেবেন। এটাকে সম্পূর্ণ অমান্য করে তারা অন্য কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, এই যে আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, আদালতকে দলীয়করণের দিকে নিয়ে যাওয়া- দেশের জন্য ও জাতির জন্য শুভ কোনো কিছু বয়ে আনতে পারে না।
এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ছাত্রদল একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে যাচ্ছে কাউন্সিলের মাধ্যমে। এই কাউন্সিল স্থগিত করার মানে কী? আপনারা (সরকার) কি পলিটিক্যাল পার্টির কাজ বন্ধ করে দিচ্ছেন- এটা নজিরবিহীন। আপনাদের মনে থাকা উচিত, ১/১১-র পরে আমাদের দলের সেক্রেটারি জেনারেল পদ নিয়ে কোর্টে গিয়েছিলেন। কোর্ট ওই সময়ে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে আদালতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আমরা দেখিনি যে, পলিটিক্যাল পার্টির কার্যক্রমে আদালত যুক্ত হচ্ছে।

বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন- জয়নাল আবেদীন, এজে মোহাম্মদ আলী, নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুবউদ্দিন খোকন, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, কায়সার কামাল, আসাদুজ্জামান আসাদ, ওমর ফারুক ফারুকী, জয়নাল আবেদীন মেজবাহ প্রমুখ।

আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ছাত্রদলের কাউন্সিল নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপেতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও যোগ দেন। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা সময় বৈঠক চলছিল।
কে এই আমান : বৃহস্পতিবার নির্বাচনের একদিন আগে আমানউল্লাহ আমানের এক মামলায় ছাত্রদলের কাউন্সিলের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দেন ঢাকার চতুর্থ সহকারী জজ আদালত। এই আদেশের পর থেকে ছাত্রদলসহ বিএনপি নেতাদের মধ্যে আমানই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এরই মধ্যে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটা বেশি হচ্ছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, ছাত্রদলের পর যুবদলের কমিটি হবে। ওই কমিটি পদপ্রত্যাশীদের অনুসারীদের মধ্যেই এই কাদা ছোড়াছুড়ি বেশি হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে কে এই আমান? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রদলের গত কেন্দ্রীয় কমিটির সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন আমানউল্লাহ আমান। তার বাড়ি কুমিল্লায়। ২০০৯ সালের টুকু-আলীম কমিটি ঘোষণার পর নরসিংদী অঞ্চলের এক নেতা বিদ্রোহ করলে আমান তার গ্রুপে থেকে বিদ্রোহে অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ওই নেতার গ্রুপে ছিলেন তিনি। পরে ২০১২ সালের জুয়েল-হাবিব কমিটিতে তাকে পদ না দেয়ায় বরিশাল অঞ্চলের এক নেতার গ্রুপে যোগ দেন। এই গ্রুপেও বেশিদিন ছিলেন না। আবারও নংরসিংদী অঞ্চলের সেই নেতার গ্রুপে সক্রিয় হন আমান। পরে ২০১৪ সালের রাজিব-আকরাম কমিটিতে তাকেসহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রভাবশালী এক নেতার ঘনিষ্ঠও তিনি।

আমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধন পাওয়া যায়। তার ঘনিষ্ঠরা জানান, মামলার আগ থেকেই তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এখনও তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির একজন যুগ্ম সম্পাদক যুগান্তরকে বলেন, আমান ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন বলে পরিচয় দেন। বিভিন্ন সময়ে মাজার শরীফকেন্দ্রিক ওরস শরীফে যান আমান। ছাত্রদলের কোনো গ্রুপেই সে স্থির থাকেননি। সন্দেহ করা হচ্ছে, আমান মামলা করলেও এই মামলার পেছনে ছাত্রদলের সাবেক কয়েক নেতা ও বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কোনো নেতারও ইন্ধন থাকতে পারে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল স্থগিত করা হয়। আমানউল্লাহ আমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার চতুর্থ সহকারী জজ আদালতের বিচারক নুসরাত জাহান সাথী এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জবাব দেয়ার জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন আদালত। বিএনপির মহাসচিবসহ ১০ নেতাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*