বিরোধী দল শূন্য করার চক্রান্তে সরকার: মির্জা ফখরুল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে যাতে বিরোধী দল না থাকে, ভিন্নমত না থাকে সেজন্য সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। আগের দিন জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বুধবার প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না, করলে অস্তিত্ব থাকত না। একথাটা বলতে উনি (প্রধানমন্ত্রী) কী এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, আসলে তারা অস্তিত্ব না রক্ষা করার জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন।’ এর আগে সেখানে দলের যৌথ সভা হয়।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। একই ভাবে আজকে ভিন্ন কায়দায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হচ্ছে।
উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাষ করে তিনি বলেন, ‘এ সরকার অত্যন্ত সচেতনভাবে রাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেই ভূমিকার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করছে একের পর এক। জুডিশিয়ারির ইন্ডিপেন্ডেস- এটা আমাদের সংবিধানে পরিষ্কার করে বলা আছে। সেই ইন্ডিপেন্ডেস এখন নিু আদালতে নেই, উপরের আদালতগুলো এখন ইনফেসড হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত হচ্ছে, আইনের চোখে যে সবাই সমান- এটাও এখানে রক্ষা করা হচ্ছে না। একই ধরনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্যরা জামিনে আছেন। অথচ দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। এটা পরিষ্কার যে, দেশনেত্রীর ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ এটা দলীয়করণের পর্যায়ে নিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে তারা দলীয়করণ করেছে। এই যে আদালতের কথা বলা হচ্ছে- নিু আদালতে কোনো সিদ্ধান্ত হয় না আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া।’

তিনি বলেন, ‘বোধ হয় পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম গণতান্ত্রিক দল আছে যারা এত বেশি সাফার করেছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য। ২ মাস আগের একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি- ২৬ লাখ আসামি করা হয়েছে। ১ লাখের উপরে মামলা। ৫শ’র উপরে নেতাকর্মী গুম। কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকে বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে একজনও নেই যাদের বিরুদ্ধে ৪০/৫০/১০০টা মামলা নেই। চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে ৩৬টা মিথ্যা মামলা হয়েছে- আমরা ঠিক বুঝি না, এটাকে কিভাবে আপনি গণতান্ত্রিক স্টেট বলবেন?’

ফখরুল বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কোনো আসামি ছিলেন নাম, তার নামই ছিল না এফআইআরে। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও তার নাম ছিল না। পরে আমরা দেখেছি, মূল যে আসামি তাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে একটা ফলস এফিডেভিট করিয়ে নেয়া হল। সেই এফআইআরের ভিত্তিতে তারেক রহমানকে আসামি করে সাজা দিয়েছে। ওই মামলার আইও বানিয়েছে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা যিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন।’

সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের সেতু ও সড়কমন্ত্রী খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। তিনি বলেন যে, এখন সড়ক খুব নিয়ন্ত্রণে আছে। প্রতিদিন ১০-এর নিচে নেই যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে একটি পরিবারের তিনজন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। প্রথম দিন একজন, পরেরদিন দু’জন। মা-মেয়ে একসঙ্গে দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন ওখানে গিয়ে মেরে দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন এ গাড়ির মালিকানা সব সরকারদলীয় লোকজনের অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এ একটা অবস্থা চলছে- কোথাও কোনো আইন নেই, কোথাও কোনো বিচার নেই, কোথাও কোনো গভার্ন্যান্স নেই। সব কলাপস হয়ে গেছে। সেই কারণে তারা (সরকার) আজকে যতই চিৎকার করুক, উন্নয়ন, উন্নয়ন, উন্নয়ন। এ উন্নয়ন একটা গল্প।’
এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, আপনার ভিন্নমত পোষণ করা যাবে না। গণতান্ত্রিক দেশে এটা থাকতে পারে যে, বাবা একটা রাজনীতি করতে পারেন, আমি আরেকটা রাজনীতি করতে পারি। আমরা ছাত্রজীবনে আমি এক রাজনীতি করেছি আর আমার বাবা আরেক রাজনীতি করেছেন। কখনও সমস্যা হয়নি। না আমার বাবার হয়েছে, না আমার হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আজকে গোটা বাংলাদেশ ও সমাজকে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। ডিভাইডেড সোসাইটি। দেখবেন যে, এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে, এখন কেউ কারও বাসায়ও যেতে চায় না, একজন আরেক ভিন্ন দল করলে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে তো দূরের কথা। দাওয়াত-টাওয়াত দিলে যেতে চায় না এবং গেলে ভাবে যে, কী যেন আবার দেখে ফেলবে তার আবার চাকরি-টাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই ভীতি সরকারি কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে, সব জায়গায়। এভাবে একটা রাষ্ট্রকে ভীতি ও ত্রাসের মধ্যে নিয়ে যাওয়া- এটা ফ্যাসিস্টদের কাজ।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, অঙ্গসংগঠনের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাদেক আহমেদ খান, সুলতানা আহমেদ, রফিকুল ইসলাম মাহতাব, শাহ নেছারুল হক, নজরুল ইসলাম মজুমদার, মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, আবুল কালাম আজাদ, মজিবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*