আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে ফখরুল: ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কারই প্রমাণ দুর্নীতি কোন পর্যায়ে

দেশে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির অপসারণের মধ্যদিয়ে এটা আজ প্রমাণিত যে, দেশে দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সরকার বাংলাদেশে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছে- মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে গণতান্ত্রিক চেতনা বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তা আজ ভূলুণ্ঠিত। দলমত নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান আসুন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ হই।

রোববার আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম খান।
‘ছাত্র লীগের শীর্ষ দু’জনের অপসারণ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এটাই প্রমাণ করেছে দেশে কি হারে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি চলছে। শুধু একটা প্রকাশ পেয়েছে। এটাতে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি জড়িত। তাদের বহিঙ্কার করতে হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। এরকম সারা দেশেই চলছে। এটি প্রমাণ করে দুর্নীতি কোন পর্যায়ে চলে গেছে। এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, তারা দুর্নীতি করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা প্রমাণিত তাদের দল দুর্নীতি করছে এবং সবাই মিলে দুর্নীতি করছে। এটা তো রিকগনিশন অব করাপশন।

ফখরুল বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধ্বংস করেছে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। এখন দেশে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ চলছে। এখানে দুটি বিষয় আছে। একটা হচ্ছে পোশাক, পোশাক পরে ভাব দেখানো হয়- এটাই গণতন্ত্র, ভেতরে ভেতরে গণতন্ত্রের উল্টো।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে আমরা যে বক্তব্যটি দিতে চাই তা হচ্ছে- আসুন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্রের মুক্তি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর, এক কথায় উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে আমাদের দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে গণতন্ত্রের চেতনার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম, সেই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই লক্ষ্যে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে বদ্ধপরিকর।

গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে দলের মহাসচিব বলেন, গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের দলের কমিটমেন্ট ১০০ ভাগ। আমাদের দলই সেই দল, যে দল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং অর্থনীতি মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। তিনি বলেন, ১০ বছর ধরে চরম রাজনৈতিক নৈরাজ্য চলছে। বিরোধী দলের ওপর চলছে নিষ্পেষণ, অত্যাচার, গুম, খুন, হামলা। যে ব্যক্তি এই সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে তার বিরুদ্ধেই নেমে আসছে খড়গ। ১০ বছরে বিরোধী দলের প্রায় ২৬ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লাখের বেশি মামলা দেয়া হয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, জাতিসংঘ আজ (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে এই দেশ তাদের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী হয়েও কিভাবে এবং কী ধরনের সরকার চালু রেখেছে যেখানে সে সনদের কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। আপনাদের মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই, আজ থেকে মাত্র সাপ্তাহ খানেক আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে বিশ্বের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময়ে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি কানাডা সরকারও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়গুলো স্পষ্টভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। গণতন্ত্রের মূল বাহন নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি ৩০ ডিসেম্বরের আগের রাতে কী হয়েছিল তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।
মিডিয়াগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, নিউজ ম্যাগাজিন ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ যে প্রবন্ধ প্রকাশ করে তার শিরোনাম ছিল- বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মৃত্যুর ওপর একটি শোকবার্তা। বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আইনবহির্ভূত খেয়াল-খুশি হত্যাকাণ্ড ঘটানো, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বেআইনি আটক, জেলখানায় জীবনের প্রতি হুমকির পরিবেশ, বন্দিদের রুমে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, খালেদা জিয়াকে আটক করে রাখার বিষয়গুলো তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, এই গণতন্ত্রহীন পরিবেশে সরকার হয়তো এই আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে পারে তারা আজ পুরো দেশ দখল করে নিয়েছে, আজ দেশে কানো বিরোধী দল নেই, তাদের সব কার্যক্রম স্তব্ধ করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে। সরকারের সর্বশেষ কার্যক্রম ছাত্রদলের কাউন্সিল ও নির্বাচন বন্ধ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে আপনারা প্রত্যক্ষ করেছেন।

ছাত্রদলের কাউন্সিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন দিয়ে তো রাজনীতি হয় না। আমি সেদিনও বলেছি, যে এভাবে রাজনীতিকে আদালত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা- এখানেই আমাদের আপত্তি। এটা নজিরবিহীন। দলের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে আদালত এবং সেটা সরকারের উদ্যোগে তারাই করাচ্ছে। এটাতে প্রমাণিত যে, এই সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বিরোধী দলে বিশ্বাস করে না। এটাই বাস্তবতা।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, দেশে দুই আইন চলছে। সরকারি দল হলে এক রকম, বিরোধী দল হলে আরেক রকম। আজ আমাদের নেত্রীকে বানোয়াট মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। তাকে জামিনও দেয়া হচ্ছে না। বিএনপি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, একটি নিু আদালত রায় দিচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ হস্তক্ষেপ করতে পারছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*